ধানের শীষে নতুন মুখ, চিন্তায় নৌকার মাঝিরা

রাজনীতি

টানা ১০ বছর পর আবারও লড়াই হবে নৌকা ও ধানের শীষে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬ আসনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী তালিকাও চূড়ান্ত। একটি বাদে বাকি ১৫ আসনে পুরনোদের ওপর আস্থা রেখেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

অন্যদিকে, বিএনপির প্রার্থী তালিকায় এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। জেলার ১৬ আসনের আটটিতে নতুন মুখ নিয়ে এসেছে দলটি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অভিজ্ঞতা ও মাঠের রাজনীতিতে চট্টগ্রামের ১৬ আসনেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটপ্রার্থীরা এগিয়ে। সে অনুপাতে অর্ধেক আসনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের থাকছে নতুন প্রার্থী। তবে নতুন বলেই ভোটের মাঠে তারা পিছিয়ে পড়বেন- এমনটি ভাবার সুযোগ নেই।

গত পাঁচ সংসদ নির্বাচনের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক চারটির (১৯৯১-২০০৮) ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চট্টগ্রামে আনুপাতিক হারে বিএনপির ভোট বেশি। সব মিলিয়ে এবার চট্টগ্রামে দুই জোটে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত মিলছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার মনে করেন, চট্টগ্রামের অধিকাংশ আসনেই আওয়ামী জোটের সংসদ সদস্যরা দুই মেয়াদে আছেন। এলাকার জনগণ ও প্রশাসনের সঙ্গে তাদের যোগাযোগও বেশি। সেই সুবিধা নিতে দলটি তাদের প্রার্থী তালিকায় তেমন কোনো পরিবর্তন আনেনি। তবে এর সুফলের পাশাপাশি অসুবিধাও আছে। ওই সব সংসদ সদস্যের ভালো-খারাপ সবই ভোটারদের জানা। সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে তারা সিদ্ধান্ত নেবেন।

‘অন্যদিকে, বিএনপি ১০ বছর পর নির্বাচনে এসেছে। তাই তাদের প্রার্থী তালিকায় পরিবর্তন থাকবে- এটা স্বাভাবিক। তবে রাজনীতি আর ভোটের মাঠে অভিজ্ঞতার আলাদা মূল্যায়ন আছে। একেবারে আনকোরা এসব প্রার্থী মাত্র ১৮ দিনে (৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন) কীভাবে ভোটারদের কাছে নিজেদের অবস্থান তৈরি করবেন তা দেখার বিষয়। সেদিক বিবেচনায় তারা হয়তো কিছুটা পিছিয়ে। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রার্থীর চাইতে প্রতীকই যে বড়’- বলেন এ বিশ্লেষক।

আগামী ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন মহাজোট ও ঐক্যফ্রন্টের আসন ভিত্তিক প্রার্থী পরিচিতি, ভোটের প্রস্তুতি, দলের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, ভোটের মাঠে প্রার্থীদের সর্বশেষ অবস্থান ও সম্ভাবনা এবং প্রার্থীদের নিয়ে ভোটাররা কী ভাবছেন- এসব নিয়ে চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদন ‘অভিজ্ঞতায় এগিয়ে আ.লীগ, ভোটের হিসাবে বিএনপি’- এর দ্বিতীয়টিতে আজ থাকছে ‘চট্টগ্রাম-৫, ৬, ৭ ও ৮’ আসনের আদ্যোপান্ত।

চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসন

হাটহাজারী আসনে আওয়ামী লীগ-বিএনপি দু’দলেই হেভিওয়েট প্রার্থী থাকার পরও শেষ পর্যন্ত দু’দলেরই মনোনয়নপ্রত্যাশীদের গলার কাঁটা হয়েছেন জোট-মহাজোটের প্রার্থীরা।

এখানে ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে প্রার্থী করা হয়েছে কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমকে। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে লড়বেন। চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে হাটহাজারী বিএনপিকে সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু ভোটের মাঠে একেবারেই নতুন এ প্রার্থীকে নিয়ে টেনশনে আছেন স্থানীয় নেতারা।

স্থানীয় সাংবাদিক এ কে এম নাজিম বলেন, ‘হাটহাজারীতে বিএনপি শক্তিশালী, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু এ আসনে এমন একটি দল থেকে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী দেয়া হয়েছে, যে দলটির উপজেলায় একটি অফিসও নেই, নেতাকর্মী তো দূরের কথা। তাই প্রার্থী কল্যাণ পার্টির হলেও পুরো বোঝাটা কাঁধে নিতে হবে বিএনপির নেতাকর্মীদের। এখন দেখার বিষয় গত দশ বছর ধরে পুলিশি তোপোর মুখে থাকা বিএনপির নেতাকর্মীরা নতুন এ প্রার্থীর জন্য কতটুকু ঝুঁকি নেন।’

তবে একসময় বিএনপির দুর্গ বলে পরিচিত এ আসন পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপির নেতাকর্মীরা।

দলটির মনোনয়ন পেয়েও জোটের জন্য আসন ছেড়ে দেয়া প্রার্থী ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা বলেন, ‘দল আমার ওপর আস্থা রেখেছে বলেই আমাকে মনোনয়ন দিয়েছিল। এখন বৃহত্তর স্বার্থে জোটের শরিক দল কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমকে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করেছে হাইকমান্ড। আমরা সবাই মিলে এ আসনে ধানের শীষকে বিজয়ী করতে কাজ করবো।’

এদিকে হাটহাজারী থেকে একাধিকবার এমপি হন জাতীয় পার্টির ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। বর্তমান সরকারে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন তিনি। এবারও মহাজোট আস্থা রেখেছে তার ওপর। বরাবরের মতো জাতীয় পার্টির দলীয় প্রতীক ‘লাঙ্গল’ বরাদ্দ পেয়েছেন।

এ আসনে দলীয় প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়ার জোরালো দাবি ছিল স্থানীয় আওয়ামী লীগের, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। এ নিয়ে তৃণমূলে ক্ষোভ রয়েছে।

গত পাঁচ বছরে এলাকার কোনো কর্মকাণ্ডে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় না করার অভিযোগ রয়েছে সংসদ সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদের বিরুদ্ধে। ফলে এবার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা তার পক্ষে আন্তরিকভাবে কাজ করবেন কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

তবে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ‘গত তিন দশক ধরে হাটহাজারীতে নির্বাচন করছি। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কাজ করছি। বিগত সময়ে এখানে জাতীয় পার্টির অবস্থান অনেক পাল্টেছে। দল এখানে সংগঠিত। জনপ্রতিনিধি হয়ে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করেছি। আমার বিশ্বাস, এবারও ভোটাররা তা মূল্যায়ন করবেন।’

এ আসনে দুই জোটের জন্যই মাথাব্যথার কারণ হতে পারেন হেফাজতে ইসলাম নেতা মঈনুদ্দিন রুহী। ইসলামী ঐক্যজোট থেকে তিনি মিনার প্রতীকে লড়ছেন। হাটহাজারী মাদরাসাকে কেন্দ্র করে এ এলাকায় হেফাজতের একটি বিশাল ভোট ব্যাংক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এসব ভোট যদি মিনার প্রতীকে যায় তবে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বেকায়দায় পড়তে পারেন।

হাটহাজারী (চট্টগ্রাম-৫) আসনে মোট ভোটার চার লাখ ৩০ হাজার ২৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ২১ হাজার ৭০ জন এবং মহিলা ভোটার দুই লাখ আট হাজার ৯৫৭ জন।

এখানে ভোটের হিসাবে সবসময় এগিয়ে বিএনপি। পরপর তিনবার ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বিএনপি এবং পরের বার অর্থাৎ ২০০৮ সালে মহাজোটের টিকিটে জাতীয় পার্টি জয়লাভ করে। তাই এবার লড়াই হবে সমানে সমান।

চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসন

রাউজান মানেই চৌধুরী পরিবার। স্বাধীনতার পর বিএনপি-আওয়ামী লীগ দু’দল থেকে যারা এ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তারা সবাই চৌধুরী পরিবারের সদস্য। একসময় রাউজানে একক আধিপত্য ছিল মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর। এখন সময় বদলে সেই রাজত্ব আওয়ামী লীগ নেতা ফজলে করিম চৌধুরীর হাতে। তবে তিনিও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আপন চাচাতো ভাই।

নির্বাচনী ডামাডোল শুরুর পর ভাবা হচ্ছিল যে, এ আসনে সাকা পরিবারের কেউ বিএনপিপ্রার্থী হবেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত তা হয়নি। অদৃশ্য কারণে শেষ মুহূর্তে বিএনপির মনোনয়ন পাননি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্ত্রী-ছেলে কেউই। ঋণ খেলাপি হওয়ায় বাতিল হয়ে যায় সাকার ভাই গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তার ছেলে সামির কাদের চৌধুরীর প্রার্থিতা। ফলে প্রায় ৪০ বছর পর সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর পরিবারের কোনো সদস্য সংসদ নির্বাচনে নেই।

সব কূল হারিয়ে রাউজানে এবার ধানের শীষের প্রার্থী করা হয়েছে ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা জসীম উদ্দিন সিকদারকে। উপজেলা বিএনপির এ সদস্য ভোটের মাঠে একেবারেই অপরিচিত মুখ। ভোটের মাঠে দক্ষ ও পুরনো প্রার্থী আওয়ামী লীগের ফজলে করিমের সঙ্গে বিএনপির এ নতুন প্রার্থী কতক্ষণ টিকতে পারবেন, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এ অবস্থায় দলের বিকল্প প্রার্থীকে জেতাতে না পারলে গুরুত্বপূর্ণ আসনটি ঐক্যফ্রন্টের হাতছাড়া হতে পারে- এমন আশঙ্কায় নেতাকর্মীরা।

রাউজান উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফিরোজ আহমদ বলেন, ‘সামির কাদের চৌধুরীর প্রার্থিতা পরিকল্পিতভাবে বাতিল করা হয়েছে। রাউজানে চৌধুরী পরিবারের কিছু ফিক্সড ভোট আছে। সামির থাকলে তা পেতে বিএনপির সহজ হতো। তবে রাউজানে প্রার্থী কোনো সমস্যা হবে না বলে আশা করছি। এখানে প্রার্থীর চেয়ে প্রতীক বড়। ধানের শীষ প্রতীক যাকেই দেয়া হোক মানুষ তাকে ভোট দেবে। ইনশা-আল্লাহ বিজয় আমাদের।’

তবে বিএনপির নেতারা যাই বলুক গত ১৮ বছরে রাউজানের পরিস্থিতি অনেক পাল্টে গেছে। রাউজানে ধানের শীষকে বিজয়ী করতে হলে বিএনপিকে চমক দেখাতে হবে। নতুন প্রার্থী নিয়ে দলটি সে কাজ কতটুকু করতে পারবে তা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

এদিকে প্রার্থী সংকটে বিএনপি যখন হাবুডুবু খাচ্ছে, তখন অনেকটাই নির্ভার আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কার প্রার্থী ফজলে করিম চৌধুরী। রাউজান উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বিএনপির প্রার্থী কে হলো তা নিয়ে আমাদের টেনশন নেই। উপজেলা আওয়ামী লীগ, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডপর্যায়ের সব নেতাকর্মী এমপি ফজলে করিমের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। গত ২২ বছরে রাউজানে ১৫ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করেছেন তিনি। এ কারণে তার বিজয় সুনিশ্চিত।’

রাউজান (চট্টগ্রাম-৬) আসনে মোট ভোটার দুই লাখ ৭০ হাজার ৪৯২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৩৯ হাজার ৫৯৮ জন এবং মহিলা ভোটার এক লাখ ৩০ হাজার ৮৯৪ জন। এখানে বর্তমান হিসাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-সমর্থিত ভোটের সংখ্যা প্রায় সমান বিবেচনা করা হয়।

১৯৯১ সাল থেকে প্রতিযোগিতামূলক চারদফা নির্বাচনে (১৯৯১-২০০৮) ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে পরপর বিএনপি এবং ২০০১ ও ২০০৮ সালে পরপর আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। তবে এবার আওয়ামী লীগ কিছুটা এগিয়ে আছে বলে স্থানীয়দের ধারণা।

চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসন

চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া-বোয়ালখালী আংশিক) আসনে কোনো দলের একক আধিপত্য নেই। এখানে কখনও আওয়ামী লীগ, কখনও বিএনপি আবার কোনো সময় জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। তবে এবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোহাম্মদ হাছান মাহমুদ অনেকটা নিশ্চিন্ত অবস্থায় ছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী বদলে এ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখছেন ভোটাররা।

বিএনপি থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়া সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী প্রার্থী হচ্ছেন- এমন প্রচার থাকার পরও এখানে প্রাথমিকভাবে মনোনয়ন দেয়া হয় বিএনপি নেতা মো. কুতুব উদ্দিন বাহারকে। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে প্রার্থী বদলে আসনটি ২০ দলীয় জোটের শরিক এলডিপিপ্রার্থী নুরুল আলমকে ছেড়ে দেয়া হয়। এতেই ভোটের মাঠে লড়াইয়ের আভাস পাচ্ছেন স্থানীয়রা।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা শাখার আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য মো. শওকত আলী নূর বলেন, ‘এলাকায় দলের অবস্থান এখন অনেক শক্তিশালী। আগামী নির্বাচনে সালাউদ্দিন কাদেরের পরিবারের কেউ নির্বাচন না করলেও তার প্রভাব থাকবে। ২০ দলীয় জোটের প্রার্থীকে জয়ী করতে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ।’

ভোটাররা বলছেন, প্রার্থীর যোগ্যতা বিবেচনায় রাঙ্গুনিয়ায় এগিয়ে আছেন এ আসনে ২০০৮ সাল থেকে টানা দুবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ। তবে নুরুল আলমকে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী ঘোষণা করায় কিছুটা বেকায়দায় পড়তে পারেন তিনি।

এ আসনে মোমবাতি প্রতীক নিয়ে মাঠে আছেন বাংলাদেশ ইসলামি ফ্রন্টের মুহাম্মদ আবু নওশাদ। তিনিও আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাছান মাহমুদের জন্য কিছুটা অসুবিধার কারণ হতে পারেন।

নৌকার প্রার্থী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘বিগত সাড়ে নয় বছর ধরে রাঙ্গুনিয়ার উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। রাঙ্গুনিয়ার মানুষ এখন মিলেমিশে আছে। দল-মত নির্বিশেষে সাধ্যমতো সেবা করার চেষ্টা করছি। বিগত প্রায় পাঁচ বছরে এলাকার শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ নানা খাতে আড়াই হাজার কোটি টাকার উন্নয়নমূলক কাজ করেছি। অন্তত এক হাজার বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি। আমার এলাকায় কে বিএনপি করে, কে জাতীয় পার্টি করে তা দেখিনি। সবাইকে সমান চোখে দেখেছি। ভোটাররা এসবের মূল্যায়ন করবেন।’

চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া-বোয়ালখালী আংশিক) আসনে মোট ভোটার দুই লাখ ৬৯ হাজার ২৯১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ জন এবং মহিলা ভোটার এক লাখ ২৯ হাজার ৭৮৬ জন।

১৯৯১ সাল থেকে প্রতিযোগিতামূলক চারদফা নির্বাচনে (১৯৯১-২০০৮) ১৯৯১ সালে কমিউনিস্ট পার্টি, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বিএনপি এবং ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হয়। ভোটের হিসাবে এ আসনে কোনো দলের একক আধিপত্য নেই। তবে ভাগ্য প্রতিবারই নির্ধারিত হয়েছে পাঁচ থেকে ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে। তাই রাঙ্গুনিয়ায় এবার নৌকা ও ধানের শীষের লড়াইটা জমবে ভালো।

চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী) আসন

বোয়ালখালী-চান্দগাঁও আসনে এবারের সবচেয়ে বড় চমক হলো টানা তিনবারের সংসদ সদস্য ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খানের দলীয় মনোনয়ন না পাওয়া। নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পেলেও ভাগ্য খোলেনি বিএনপি এ নেতার। এ আসনে বিএনপির হাইকমান্ড শেষ মুহূর্তে ভরসা রেখেছেন চট্টগ্রাম নগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবু সুফিয়ানের ওপর।

ভোটাররা বলছেন, দলটির এ সিদ্ধান্ত ভোটের মাঠে বিএনপির ধানের শীষকে এগিয়ে রাখবে। কারণ বারবার ভোট দিয়ে বিএনপির মোরশেদ খান ও মহাজোটের মইনউদ্দীন খান বাদলকে বিজয়ী করলেও চট্টগ্রাম মহানগরের সঙ্গে যুক্ত এ সংসদীয় আসনে তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। বিশেষ করে বোয়ালখালী উপজেলার মানুষ উন্নয়নবঞ্চিত বারবার। এ উপজেলার মানুষের প্রাণের দাবি কালুরঘাট সেতু, এটি নিয়েও নেই কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি। তাই তারা নতুন মুখের খোঁজে ছিলেন।

এদিকে আবু সুফিয়ানকে দলীয় মনোনয়ন দেয়ায় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, মোরশেদ খান এ আসনটি থেকে চারবার নির্বাচিত হয়েছেন। তাই এখানে নতুন প্রার্থীকে জেতানো বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হবে। তবে অনেকে মনে করেন, এখানে মোরশেদ খান বারবার এমপি হলেও তার প্রতি আস্থা নেই জনগণের। আবু সুফিয়ান গত ১০ বছর ধরে রাজপথে আছেন। তিনি এখানে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। তাই এ আসন উদ্ধারে তার মতো তরুণ নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল।

স্থানীয়রা বলছেন, ধানের শীষের প্রার্থী আবু সুফিয়ান সবার আগে বিরোধিতার মুখে পড়বেন বিএনপির মোরশেদ খানের সমর্থকদের। কথিত আছে, ২০০৮ সালে মোরশেদ খান ভোটে অযোগ্য হলে নগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এরশাদ উল্লাহকে প্রার্থী করা হয়। কিন্তু মোরশেদ খানের অসহযোগিতায় তিনি পরাজিত হন।

এদিকে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে নিজের প্রার্থিতা টিকিয়েছেন মহাজোটপ্রার্থী ও জাসদ নেতা মইনউদ্দীন খান বাদল। তিনি নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করবেন। আওয়ামী লীগ থেকে টিকিট না পাওয়ার অনিশ্চয়তায় স্ত্রীকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কিনিয়ে নিজে নিয়েছিলেন স্বতন্ত্র মনোনয়ন ফরম। কিন্তু শেষপর্যন্ত মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে টিকে যান তিনি।

পরপর দু’বার জোটের শরিক জাসদকে আসন ছেড়ে দেয়ার পর এবার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ভেতরেই জোর দাবি উঠেছিল, বোয়ালখালী-চান্দগাঁও আসনে দলীয় প্রার্থী দেবার। আওয়ামী লীগে যে অংশটি জাসদ নেতা মইনউদ্দীন খান বাদলের সঙ্গে ছিল তারাও নতুন মুখের দাবি তুলেছিলেন। এছাড়া এ আসনের নগর অংশে প্রভাব রয়েছে চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক ছালাম এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির। তাদের সমর্থকরা বরাবরই মইনউদ্দীন খান বাদল বিরোধী শিবিরে ছিলেন।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ, দু’বার ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার সারাদেশে হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন করে। কিন্তু বোয়ালখালীতে মইনউদ্দীন খান বাদল তেমন কোনো উন্নয়ন দেখাতে পারেননি। তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি ছড়িয়ে ফায়দা নেন বর্তমান সংসদ সদস্য। তবে বাদলের সমর্থকদের দাবি, মনোনয়ন নিশ্চিতে সে বিরোধে মিটে গেছে।

তবে স্থানীয়দের ধারণা, এবারের নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে বাদলকে অতিক্রম করতে হবে কালুরঘাট নতুন সেতুর বাধা।

গত দশ বছরেও আলোর মুখ না দেখা ‘কালুরঘাট সেতু প্রকল্প’ নিয়ে মইনউদ্দিন খান বাদল বলেন, ‘এবার নির্বাচিত হলে আমার আর কোনো কাজ থাকবে না। নির্বাচিত হবার প্রথম দিন থেকে আমি কালুরঘাট সেতু নিয়ে কাজ করবো। কথা দিচ্ছি আগামী এক বছরের মধ্যে যদি কালুরঘাট সেতুর নির্মাণকাজ দৃশ্যমান করতে না পারি তাহলে আমি সংসদ থেকে পদত্যাগ করবো।’

সবমিলিয়ে এবার দারুণ বেকায়দায় টানা দু’বারের সংসদ সদস্য মইনউদ্দিন খান বাদল। কিন্তু বিএনপিপ্রার্থী নতুন হওয়ায় লড়াইটা সমানে সমান হবে বলেই ধারণা ভোটারদের।

চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনে মোট ভোটার চার লাখ ৮৩ হাজার ১৪৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৪৫ হাজার ৫৩০ জন এবং মহিলা ভোটার দুই লাখ ৩৭ হাজার ৬১৫ জন।

১৯৯১ সাল থেকে প্রতিযোগিতামূলক চারদফা নির্বাচনে (১৯৯১-২০০৮) এখানে পরপর তিনবার অর্থাৎ ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বিএনপি এবং ২০০৮ সালে ১৪ দলীয় জোটের নৌকার প্রার্থী জয়ী হন। ভোটের হিসাবে এ আসনে বিএনপির অবস্থান কিছুটা ভালো। তবে ভাগ্য প্রতিবারই নির্ধারিত হয়েছে ১০ থেকে ১৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে। তাই বোয়ালখালীতে এবার নৌকা ও ধানের শীষের লড়াইটা জমবে বেশ।
-জাগো নিউজ