‘নেতাকর্মীরা যখন-তখন এসে বঙ্গবন্ধুর কাজের অনেক ক্ষতি করেছিল’

বঙ্গবন্ধুর সময় নষ্ট করে নেতাকর্মীরা নিজেদের কর্তৃত্ব দেখলেও তারা বঙ্গবন্ধুর অনেক ক্ষতি করেছিল— জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের জবানিতে উচ্চারিত হলেও কথাগুলো আসলে ‘বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায়’ বই থেকে উদ্ধৃতি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আরও দুটি বই ‘মুজিব ভাই’ ও ‘শেখ মুজিব ট্রায়ামফ অ্যান্ড ট্রাজেডি’ নিয়ে আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয় ‘ঢাকা লিট ফেস্ট-২০১৮’-এর উদ্বোধনী দিন বৃহস্পতিবার।দিনগুলি: স্মৃতিচারণ’ শীর্ষক এ সেশনেই ড. আনিসুজ্জামান ওই উদ্ধৃতি দেন।

‘বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায়’, ‘মুজিব ভাই’ এবং ‘শেখ মুজিব ট্রায়ামফ অ্যান্ড ট্রাজেডি’ বই তিনটির লেখক যথাক্রমে মফিজ চৌধুরী, এবিএম মুসা এবং এস এ করিম।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃতে গঠিত সরকারের অধীনে ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত খনিজ ও জ্বালানিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালিন করেন ড. মফিজ চৌধুরী। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন ‘বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায়’। বইটি থেকে উদ্ধৃতি করে জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর সময় নষ্ট করে নেতাকর্মীরা নিজেদের কর্তৃত্ব দেখলেও বঙ্গবন্ধুর অনেক ক্ষতি করেছিল।’

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কাজ করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু যে সমস্যার মধ্যে পড়ছিলেন তার একটি ভালো বর্ণনা মফিজ চৌধুরীর ‘বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায়’ বইতে আছে। প্রথমত, বইতে তিনি বলেছেন, আমলাদের যথেষ্ট সহযোগিতা তিনি পাননি। এটা একটা উল্লেখযোগ্য কথা। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, তিনি (মফিজ চৌধুরী) মন্ত্রী হিসেবে যখন বিদেশে যাবেন, তখন যে তার প্রাপ্য লাল পাসপোর্ট, সেটি আমলারা তাকে করে দেননি। বাংলাদেশের নাগরিকদের সাধারণ পাসপোর্ট নিয়েই তাকে বিদেশে যেতে হয়েছিল। এটা একটা সাধারণ ব্যাপার, কিন্তু আমাদের মনের মধ্যে থাকে যে— কেন দিলো না?’

ড. আনিসুজ্জামান আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু তার নিজের বিবেচনায় বলেছিলেন, পাকিস্তান আমলে যারা কাজ করতো তাদের পরীক্ষা না করে, পুনর্নিয়োগ করা ঠিক হয়নি। তেমনি পাকিস্তান প্রত্যাগত আমলাদের নির্বিচারে গ্রহণ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, তার অভিযোগ ছিল পরিকল্পনা কমিশন সম্পর্কে। পরিকল্পনা কমিশন একটি সুপার মিনিস্ট্রি হিসেবে কাজ করেছে এবং উনার পাঠানো সুপারিশগুলো আমলারা খুব একটা আমলে নেননি। তবে পরিকল্পনা কমিশনের বক্তব্য আমরা পাই ড. নুরুল ইসলামের ইংরেজি দুটি বইতে। যেখানে পরিকল্পনা কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। নুরুল ইসলাম বলেছেন, আমলাদের সহযোগিতা বঙ্গবন্ধু পাননি, বরং তিনি বাধা পেয়েছেন। এই অবস্থায় তিনি যখন কাজ করছেন তার দফতর থেকে জ্বালানি এবং তেলকে যুক্ত করা হলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে, এবং তাকে তা বলা হলো না। তখন ভীষণ অভিমান করলেন, কারণ তখন তিনি বিদেশে তেল রফতানিকারকদের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। ওই আলোচনা অসমাপ্ত রেখে ওই মন্ত্রণালয় তাকে ছেড়ে দিতে হয়। তারপরে ১৯৭৪ সালের জুলাই মাসে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। তারা সাতজন একযোগে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন এই অর্থে যে— বঙ্গবন্ধু যেটা ভালো মনে করেছেন, সেটাই করতে বলেছেন। তার বইতে তিনি আরও আক্ষেপের সুরে লিখেছেন, আওয়ামী লীগের কর্মীরা যখন তখন প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে ঢুকে যাচ্ছে, তাকে কাজ করতে দিচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীকে যে তার দায়িত্ব পালন করতে দিতে হবে, সময় দিতে হবে— এই বোধ রাজনৈতিক কর্মীদের ছিল না। তারা বঙ্গবন্ধুর সময় নষ্ট করে নিজেদের কর্তৃত্ব দেখলেও বঙ্গবন্ধুর অনেক ক্ষতি করেছিল।’

বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক ড. শামসুজ্জামান খান বলেন, “আমার নিজের দুই-তিনবার কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। আমি সেগুলো রেকর্ড করে নিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু কখনও এলিট রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, দেশ গঠনের পরেও। বঙ্গবন্ধুর আলাপচারিতায় তিনি বলেন, ‘২৫ মার্চ রাতে স্বাধীনতা ঘোষণার পর গ্রেফতার হয়ে যাই। আমি বিভিন্ন চ্যানেলে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করে যাই। নাহলে তোমরা অস্ত্র অন্যান্য সুবিধা পেতে না। আমাকে ধরতে না পারলে ওরা আরও বেশি খুন করতো, আন্তর্জাতিকভাবে আমরা বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে প্রমাণিত হতাম এবং আরও বেশি দেশ আমাদের আন্দোলন নিয়ে সন্দেহ করতো।’”

গবেষক ও লেখক আফসান চৌধুরী, ‘আমাদের দুই ধরনের ইতিহাস চর্চা— লিখিত ইতিহাস এবং মৌখিক ইতিহাস। দলিলপত্র নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখি নিজে যা লিখে। স্মৃতিচারণের বিষয়ে। শেখ মুজিবুর রহমানের ইতিহাস ছিল অকথ্য। ’৭১-এর আগে কেউ তাকে নিয়ে লেখেনি। কোনও লিখিত দলিল নেই। যারা উনার সঙ্গে কাজ করেছেন, তারা কিন্তু বলেননি, লেখেননি। মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরী শেখ সাহেবের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ’৪৬-এর দাঙ্গার সময় তারা দুজন বস্তি পাহারা দিয়েছেন।’

আফসান চৌধুরী বলেন, ‘তিনি (মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরী) আমাকে নিজে বলেছিলেন, একজন লোকের কথা ভাবতাম। দেশ স্বাধীনের নেতা একজনই হইতে পারে, তিনি শেখ মুজিবুর রহমান। আজকে যখন গোপন দলিল পাওয়া যায় তাতে বোঝা যায় সরকার কী ভাবতো। শেখ সাহেবের ভাবনা কিন্তু আমরা তাতে পাই না। ইতিহাস ধারাবাহিকভাবে শুরু হয়েছে ’৪৭-এর পর। শেখ মুজিবুর রহমান কোনোদিন দল পাল্টাননি। শেখ মুজিবুর রহমান করেছেন বাংলাদেশের ধারাবাহিক রাজনীতি। এর জন্য স্মৃতিচারণের বই পড়া জরুরি। তার সম্পর্কে জানা যাবে। শেখ মুজিবুর রহমান প্রক্রিয়ার মানুষ ছিলেন। প্রক্রিয়াধীনভাবে দেশ স্বাধীন হবে— এটা তিনি জানতেন। এটা হলো বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস।’

মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষক কাইয়ুম খান বলেন, “করিম সাহেবের বইতে বঙ্গবন্ধুর চারিত্রিক বিষয় উঠে এসেছে। বঙ্গবন্ধু তাত্ত্বিক বিষয়ের মানুষ ছিলেন না, তিনি তড়িৎ সিদ্ধান্তের লোক ছিলেন। এস এ করিমের বইটি পড়লে বঙ্গবন্ধুকে ভালো জানা যায়। এস এ করিম তার বইতে বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু কাছের মানুষকে আরও কাছে টেনে নিতে। তার পরিণতি কী আমরা সবাই ’৭৫-এর আগস্ট দেখলে জানতে পারি।’”